
বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় কেন বারবার হয়? কারণ ও প্রভাব
বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় কেন বারবার হয়? কারণ, উৎপত্তি ও বাংলাদেশের ওপর প্রভাব
ভূমিকা
বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় কেন বারবার হয়? বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা প্রায় প্রতিবছরই দেখা দেয়।
কখনো তা আসে প্রবল বাতাস নিয়ে, কখনো ভারী বৃষ্টি বা জলোচ্ছ্বাসের রূপে,
আর প্রতিবারই উপকূলের মানুষের জীবন ও সম্পদ ক্ষতির মুখে পড়ে। এসব ঘূর্ণিঝড়ের বড় একটি অংশের জন্ম বঙ্গোপসাগরে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই সাগরেই কেন বারবার ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়?
উত্তর খুঁজলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে: সমুদ্রের উষ্ণ পানি, বাতাসে প্রচুর জলীয় বাষ্প, অনুকূল বায়ুপ্রবাহ এবং বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক অবস্থান।
এর সঙ্গে যোগ হয় বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ নিচু উপকূল, যা ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়িয়ে তোলে। নিচের আলোচনায় সহজ ভাষায় দেখা যাক,
বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় কীভাবে সৃষ্টি হয় এবং তা আমাদের ওপর কী প্রভাব ফেলে।
১. বঙ্গোপসাগরের পানির তাপমাত্রা বেশি
ঘূর্ণিঝড় তৈরিতে উষ্ণ সমুদ্রের পানির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রের উপরিভাগের তাপমাত্রা সাধারণত প্রায় ২৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে,
এবং অন্যান্য পরিবেশগত শর্তও অনুকূলে থাকলে, ঘূর্ণিঝড় জন্ম নিতে পারে।
বছরের অনেকটা সময় বঙ্গোপসাগরের পানি উষ্ণ থাকে। প্রাক্-বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এই তাপমাত্রা বিশেষভাবে ঘূর্ণিঝড়ের অনুকূলে চলে যেতে পারে।
উষ্ণ সমুদ্রের পানি বাষ্প হয়ে বাতাসে মেশে। পরে এই জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হলে তাপ ছাড়ে, আর সেই তাপ ঝড়ের ভেতরের বাতাসকে আরও ওপরে ঠেলে দেয়।
পরিবেশ অনুকূল থাকলে এভাবেই একটি ঝড় শক্তি সঞ্চয় করে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে।
২. প্রচুর জলীয় বাষ্প ঘূর্ণিঝড়কে শক্তি দেয়
বঙ্গোপসাগর একটি বিশাল সমুদ্রাঞ্চল। এর পানি থেকে বিপুল পরিমাণ বাষ্প প্রতিনিয়ত বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, এবং এই জলীয় বাষ্পই ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে।
উষ্ণ পানির ওপরের আর্দ্র বাতাস ওপরে উঠে ঠান্ডা হয়। তখন জলীয় বাষ্প ছোট ছোট পানির কণায় পরিণত হয় এবং সুপ্ত তাপ ছেড়ে দেয়।
এই তাপ ঝড়ের কেন্দ্রে নিম্নচাপ টিকিয়ে রাখে, পাশাপাশি বায়ুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহকেও জোরালো করে।
তবে কেবল জলীয় বাষ্প থাকলেই ঘূর্ণিঝড় হয় না। এর জন্য উপযুক্ত বায়ুচাপ, বাতাসের ঘূর্ণন এবং বায়ুমণ্ডলের অন্যান্য অবস্থাও দরকার।
৩. বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক অবস্থান
ভারত মহাসাগরের উত্তর-পূর্ব অংশে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান। এর উত্তরে বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্বাঞ্চল, পূর্বে মিয়ানমার এবং পশ্চিমে ভারতের পূর্ব উপকূল।
উত্তর দিকে স্থলভাগ ও উপকূল থাকায় ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ এবং স্থলে আঘাতের সম্ভাবনা নানাভাবে প্রভাবিত হয়।
সমুদ্রে তৈরি হওয়া ঘূর্ণিঝড় অনুকূল বায়ুপ্রবাহ পেলে উত্তর বা উত্তর-পূর্ব দিকে এগিয়ে বাংলাদেশ ও আশপাশের উপকূলে পৌঁছাতে পারে।
অবশ্য সব ঘূর্ণিঝড় একই পথ ধরে না। কোনোটি ভারতের উপকূলে আছড়ে পড়ে,
কোনোটি যায় মিয়ানমারের দিকে, আবার কোনোটি সমুদ্রের ওপরেই দুর্বল হয়ে মিলিয়ে যায়।
৪. বাতাসের ঘূর্ণন ও নিম্নচাপের ভূমিকা
নিম্নচাপের সৃষ্টি ঘূর্ণিঝড় তৈরির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কোনো অঞ্চলে বায়ুচাপ কমে গেলে আশপাশের বাতাস সেদিকে ছুটে যায়।
পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে এই বাতাসের গতিপথ বেঁকে যায়, যাকে কোরিওলিস প্রভাব বলে।
বঙ্গোপসাগরের অক্ষাংশে কোরিওলিস প্রভাব ঘূর্ণিঝড়ের প্রয়োজনীয় ঘূর্ণন তৈরিতে সাহায্য করে। বিষুবরেখার একেবারে কাছে এই প্রভাব সাধারণত দুর্বল থাকে,
তাই সেখানে ঘূর্ণিঝড় গঠনের সম্ভাবনাও তুলনামূলকভাবে কম।
সমুদ্রের ওপর নিম্নচাপ, পর্যাপ্ত আর্দ্রতা আর অনুকূল বায়ুপ্রবাহ একসঙ্গে মিললে একটি দুর্বল নিম্নচাপ ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করে এবং শেষ পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে।
৫. কেন বর্ষার আগে ও পরে ঘূর্ণিঝড় বেশি হয়?
বঙ্গোপসাগরে সারা বছর সমান হারে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয় না। এপ্রিল–মে এবং অক্টোবর–নভেম্বর মাসে এর অনুকূল পরিস্থিতি সাধারণত বেশি দেখা যায়,
তাই এই দুটি সময়কে ঘূর্ণিঝড়ের গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম ধরা হয়।
বর্ষার আগে সমুদ্রের পানি ক্রমে উষ্ণ হয়ে ওঠে। একই সময়ে বায়ুমণ্ডলের কিছু পরিস্থিতিও ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির পক্ষে চলে আসে।
বর্ষার শেষে ও পরে চিত্রটা আবার বদলায়। সমুদ্রের উষ্ণতা, আর্দ্রতা ও বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন তখন নতুন করে ঘূর্ণিঝড় তৈরির সুযোগ করে দিতে পারে।
তবে প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা এক থাকে না; কোনো বছর বেশি হয়, কোনো বছর কম।
৬. বাংলাদেশের উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি বেশি হয় কেন?
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত উপকূল। এ অঞ্চলের অনেক এলাকা নিচু এবং নদীবিধৌত বদ্বীপের অংশ।
ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে জলোচ্ছ্বাস এলে তাই বিস্তীর্ণ এলাকা সহজেই প্লাবিত হতে পারে।
উপকূলের কাছেই রয়েছে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার বিশাল বদ্বীপ। এর বহু স্থানে মানুষের বসতি, কৃষিজমি আর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় সমান উচ্চতায় অবস্থিত।
ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রবল বাতাস, ভারী বৃষ্টি এবং অস্বাভাবিকভাবে উপকূলে উঠে আসা সমুদ্রের পানি বড় ধরনের ক্ষতি ঘটাতে পারে। নদী ও খাল বেয়ে লবণাক্ত পানি ভেতরে ঢুকে পড়লে কৃষিজমি ও পানির উৎসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বঙ্গোপসাগরের উত্তর অংশের উপকূল ফানেল-আকৃতির। অনেক পরিস্থিতিতে এই বিন্যাস জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা বাড়িয়ে দিতে পারে। তবু প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি, গতিপথ, জোয়ার, বাতাস এবং স্থানীয় ভূপ্রকৃতির ওপর।
৭. জলবায়ু পরিবর্তন কি ঘূর্ণিঝড় বাড়াচ্ছে?
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দুটোই বাড়ছে। উষ্ণ সমুদ্র কিছু পরিস্থিতিতে ঘূর্ণিঝড়কে বাড়তি শক্তি অর্জনের সুযোগ দিতে পারে।
আবার সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হলে একই মাত্রার জলোচ্ছ্বাসও উপকূলে আগের চেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে।
তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বঙ্গোপসাগরে প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে বাড়ছে, এমন সিদ্ধান্তে সরাসরি পৌঁছানো ঠিক নয়। ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা,
তীব্রতা ও গতিপথের পরিবর্তন তিনটি আলাদা বিষয়। এগুলো বুঝতে দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়া ও জলবায়ুর তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি কমাতে তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পাশাপাশি আগাম সতর্কতা, উপকূলীয় বাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র এবং দুর্যোগ প্রস্তুতিকে শক্তিশালী করতে হবে।
৮. ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি কমানোর উপায়
ঘূর্ণিঝড় পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু সঠিক প্রস্তুতি থাকলে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়।
- আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে।
- সতর্কসংকেত জারি হলে নিরাপদ ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হবে।
- উপকূলীয় এলাকায় পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র ও নিরাপদ সড়ক তৈরি করতে হবে।
- উপকূলের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ করতে হবে।
- শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, টর্চ ও জরুরি কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে।
- বিপদের সময় নদী, সমুদ্র ও বেড়িবাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে।
উপসংহার
উষ্ণ সমুদ্রের পানি, প্রচুর জলীয় বাষ্প, নিম্নচাপ, বাতাসের ঘূর্ণন এবং অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থান মিলেই বঙ্গোপসাগরকে ঘূর্ণিঝড়ের এক নিয়মিত উৎসে পরিণত করেছে।
এপ্রিল–মে ও অক্টোবর–নভেম্বর মাসে এই অনুকূল পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়।
বাংলাদেশের নিচু বদ্বীপ আর ঘনবসতিপূর্ণ উপকূল ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস, দ্রুত সতর্কবার্তা,
উপকূলীয় বন সংরক্ষণ এবং জনসচেতনতা বাড়াতে পারলে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি অনেকখানি কমানো সম্ভব।
মন্তব্য প্রধান বন্ধ আছে।
[…] রাস্তায় চলে অসংখ্য বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়িসহ নানা যানবাহন। […]