
সুন্দরবন কেন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন?
সুন্দরবন কেন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন?
পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবনের খ্যাতি সর্বত্র। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উপকূলজুড়ে এই বনের বিস্তার।
অসংখ্য নদী, খাঁড়ি, জোয়ার-ভাটার পানি আর লবণসহিষ্ণু গাছপালা মিলে এখানে গড়ে উঠেছে এক অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ। রয়েল
বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল হওয়াই সুন্দরবনের একমাত্র পরিচয় নয়; উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও
মানুষের জীবিকার ক্ষেত্রেও বনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, সুন্দরবন কেন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন? এর আয়তন, ভৌগোলিক অবস্থান,
প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও জীববৈচিত্র্যের দিকে তাকালে উত্তরটা সহজেই মেলে।
ম্যানগ্রোভ বন কী?
ম্যানগ্রোভ বন এক ধরনের উপকূলীয় বন। লবণাক্ত কিংবা লবণাক্ত-মিঠাপানির মিশ্র পরিবেশে বেড়ে ওঠা বিশেষ ধরনের গাছ এখানে জন্মায়।
নদীর মোহনা, বদ্বীপ, জোয়ার-ভাটাপ্রবণ উপকূল এবং কাদামাটিযুক্ত নিচু জমিতেই এসব গাছ সাধারণত দেখা যায়।
ম্যানগ্রোভ গাছের শিকড় বিশেষ ধরনের। এই শিকড় কাদামাটিতে গাছকে টিকিয়ে রাখে, অক্সিজেন গ্রহণেও সাহায্য করে।
অনেক প্রজাতি লবণাক্ত পরিবেশেও বেঁচে থাকতে পারে। সুন্দরবনের উল্লেখযোগ্য উদ্ভিদের মধ্যে আছে সুন্দরী, গরান, গেওয়া ও কেওড়া।
সুন্দরবন কোথায় অবস্থিত?
সুন্দরবনের অবস্থান বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূলে, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীব্যবস্থার বিশাল বদ্বীপ অঞ্চলে। বাংলাদেশ অংশটি খুলনা,
বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের দক্ষিণে ছড়িয়ে আছে। বনের পশ্চিমাংশ পড়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে।
এখানে অসংখ্য নদী ও ছোট-বড় খাঁড়ি জালের মতো ছড়িয়ে আছে। প্রতিদিনের জোয়ার-ভাটায় বনের অনেক অংশে পানির স্তর বদলে যায়।
নদীবাহিত পলি জমে এখানকার ভূমি তৈরি হয় এবং বদলাতে থাকে। এসব প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের বিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছে।
সুন্দরবন কেন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন?
মূলত বিশাল বিস্তৃতি এবং একটানা ম্যানগ্রোভ বনভূমির কারণেই সুন্দরবনকে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বলা হয়। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী,
বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে সুন্দরবন প্রায় ১০,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এই এলাকায় বনভূমির পাশাপাশি নদী, খাঁড়ি, জলাভূমি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক অঞ্চলও রয়েছে।
UNESCO World Heritage Centre+1
এত বিশাল আয়তনের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করেছে।
১. বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি
বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে সুন্দরবন ছড়িয়ে আছে। নদী, দ্বীপ আর ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদসমৃদ্ধ অঞ্চল মিলে এখানে একটি বড় প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছে। এই বিস্তৃতিই সুন্দরবনকে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে পরিচিত করেছে।
২. গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপের প্রভাব
গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী প্রচুর পলি বহন করে বঙ্গোপসাগরে নিয়ে আসে। দীর্ঘদিন ধরে সেই পলি জমে বদ্বীপের নানা দ্বীপ ও নিচু ভূমি তৈরি হয়েছে। ম্যানগ্রোভ গাছ জন্মানোর উপযোগী পরিবেশ গড়ে উঠেছে এসব অঞ্চলেই।
UNESCO World Heritage Centre+1
৩. জোয়ার-ভাটার অনুকূল পরিবেশ
সুন্দরবনে প্রতিদিন জোয়ার-ভাটা হয়। জোয়ারে লবণাক্ত কিংবা লবণাক্ত-মিঠাপানির মিশ্র পানি বনের বিভিন্ন অংশে ঢোকে, ভাটায় পানির স্তর নেমে যায়।
এই নিয়মিত পানিপ্রবাহ ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। নদী ও খাঁড়ির মাধ্যমে পলি ও পুষ্টি উপাদানও বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
৪. লবণসহিষ্ণু উদ্ভিদের বিস্তার
সুন্দরবনের গাছপালা বিশেষ পরিবেশে টিকে থাকার উপযোগী। এখানকার অনেক উদ্ভিদ লবণাক্ত পানি, নরম কাদামাটি ও নিয়মিত জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে।
সুন্দরী, গরান, গেওয়া ও কেওড়া এই বনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গাছ। এদের নানা ধরনের শিকড় মাটিতে গাছকে স্থির রাখে, কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে অক্সিজেন গ্রহণেও সাহায্য করে। তাই প্রতিকূল উপকূলীয় পরিবেশেও এরা বেড়ে উঠতে পারে।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য
সুন্দরবন কেবল একটি বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন নয়; অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসও বটে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বানর, বন্য শূকর,
নানা প্রজাতির পাখি, সাপ, কুমির ও মাছ এখানে দেখা যায়। নদী ও খাঁড়ির জলজ প্রাণীর সমাহারও বিচিত্র।
UNESCO World Heritage Centre+1
এই জীববৈচিত্র্য খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। যেমন, জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাছ ও কাঁকড়া।
অন্যদিকে বাঘসহ নানা শিকারি প্রাণী অন্য প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
উপকূল রক্ষায় সুন্দরবনের ভূমিকা
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জন্য সুন্দরবন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। ঘন গাছপালা ও বিস্তৃত জলাভূমি ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ঢেউয়ের প্রভাব কিছুটা কমায়। ম্যানগ্রোভ গাছের শিকড় মাটি আঁকড়ে ধরে থাকে বলে উপকূলীয় ভূমিক্ষয়ও কমে।
UNESCO World Heritage Centre+1
সুন্দরবন বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ধারণ করে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে অবদান রাখে। এর নদী ও জলাভূমি মাছসহ নানা জলজ প্রাণীর প্রজনন ও বেড়ে ওঠার পরিবেশও তৈরি করে।
সুন্দরবনের ওপর কী কী হুমকি রয়েছে?
বিশাল আয়তন ও প্রাকৃতিক গুরুত্ব সত্ত্বেও সুন্দরবন নানা সমস্যার মুখোমুখি।
জলবায়ু পরিবর্তন: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও তাপমাত্রার পরিবর্তন বনের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস: শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় গাছপালা, বন্যপ্রাণী ও বনভূমির ক্ষতি করতে পারে।
লবণাক্ততার পরিবর্তন: নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেলে কিছু উদ্ভিদের বেঁচে থাকা কঠিন হতে পারে।
দূষণ: নদী ও আশপাশের পরিবেশে দূষণ ছড়ালে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের ক্ষতি হতে পারে।
অবৈধ শিকার ও সম্পদ আহরণ: বন্যপ্রাণী শিকার এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে বনজ সম্পদ সংগ্রহ জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
তাই সুন্দরবন রক্ষায় বন বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠী, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
সুন্দরবন ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য কেন?
সুন্দরবনের অনন্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও জীববৈচিত্র্যই একে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় জায়গা করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের সুন্দরবন এই স্বীকৃতি পায় ১৯৯৭ সালে, আর ভারতের সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান পায় ১৯৮৭ সালে।
UNESCO World Heritage Centre+1
এই স্বীকৃতি সুন্দরবনের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব তুলে ধরে। একই সঙ্গে এর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বিপন্ন প্রজাতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট করে।
উপসংহার
বাংলাদেশ ও ভারতজুড়ে বিস্তৃত বনভূমি এবং তার সংশ্লিষ্ট উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র মিলে এক বিশাল প্রাকৃতিক অঞ্চল গড়েছে;
সে কারণেই সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপ, জোয়ার-ভাটার প্রভাব, পলিমাটির উপস্থিতি ও লবণসহিষ্ণু উদ্ভিদের
বিস্তার এই বন গড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
সুন্দরবন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ, কিন্তু কেবল সেটুকুই নয়; বিশ্বব্যাপী জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উপকূলীয় সুরক্ষারও
এটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই অনন্য বনকে রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
মন্তব্য প্রধান বন্ধ আছে।
[…] নদীব্যবস্থা, নিচু বদ্বীপ অঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তিতা একে এই পরিবর্তনের […]