
সম্পদ ও অর্থনৈতিক কার্যাবলি: ধারণা, প্রকারভেদ ও গুরুত্ব
সম্পদ ও অর্থনৈতিক কার্যাবলি: ধারণা, প্রকারভেদ ও গুরুত্ব
মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। খাবার, পোশাক, বাসস্থান, বিদ্যুৎ, পানি কিংবা
নানা ধরনের সেবা—প্রতিদিনের এসব চাহিদা মেটাতে আমরা প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট সম্পদের ওপর নির্ভর করি।
আবার এই সম্পদ কাজে লাগিয়েই মানুষ কৃষি, শিল্প, ব্যবসা ও সেবার মতো
বহুমুখী অর্থনৈতিক কাজ পরিচালনা করে।
এ কারণে সম্পদ ও অর্থনৈতিক কার্যাবলি ভূগোলের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
সম্পদ কী?
যে বস্তু, শক্তি বা উপাদান মানুষের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম এবং অর্থনৈতিক বা সামাজিকভাবে ব্যবহারযোগ্য, তাকেই সম্পদ বলা যায়। পানি, মাটি, বন,
খনিজ, সূর্যের আলো, এমনকি মানুষ ও তার দক্ষতাও ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে সম্পদের উদাহরণ।
কোনো সম্পদের গুরুত্ব নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর: এর উপযোগিতা, প্রাপ্যতা এবং মানুষের প্রযুক্তিগত জ্ঞান। একসময় যে বস্তুকে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়,
নতুন প্রযুক্তির কল্যাণে সেটিই মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
সম্পদের প্রধান শ্রেণিবিভাগ
সম্পদকে সাধারণত কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।
১. প্রাকৃতিক সম্পদ
প্রকৃতি থেকে যে সম্পদ পাওয়া যায়, সেটিই প্রাকৃতিক সম্পদ। মাটি, পানি, বন, নদী, প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, খনিজ ও সূর্যের আলো এই শ্রেণির অন্তর্গত।
প্রাকৃতিক সম্পদের সবটা এক রকম নয়; এর কিছু নবায়নযোগ্য, কিছু অনবায়নযোগ্য। সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তি প্রথম ধরনের উদাহরণ। কয়লা,
প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিভিন্ন খনিজ পড়ে দ্বিতীয় ধরনে, অর্থাৎ অনবায়নযোগ্য সম্পদের মধ্যে।
২. মানবসম্পদ
মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, শ্রম ও অভিজ্ঞতা মিলিয়েই মানবসম্পদ। কৃষক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক কিংবা কারিগর—প্রত্যেকে নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
৩. অর্থনৈতিক সম্পদ
উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি কাজে লাগে এমন সম্পদকে অর্থনৈতিক সম্পদ বলা হয়। জমি, মূলধন, যন্ত্রপাতি ও শ্রম এই ধারণার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
অর্থনৈতিক কার্যাবলি কী?
পণ্য ও সেবার উৎপাদন, বিনিময় ও ব্যবহারকে ঘিরে মানুষ যেসব কাজ করে, সেগুলোই অর্থনৈতিক কার্যাবলি। মানুষের জীবিকা অর্জন ও চাহিদা পূরণের সঙ্গে এসব কাজের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
এই কার্যাবলিকে সাধারণত তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়:
- প্রথম পর্যায়ের কার্যাবলি
- দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যাবলি
- তৃতীয় পর্যায়ের কার্যাবলি
প্রথম পর্যায়ের অর্থনৈতিক কার্যাবলি
প্রকৃতি থেকে মানুষ সরাসরি যেসব সম্পদ সংগ্রহ বা উৎপাদন করে, সেই কাজগুলো প্রথম পর্যায়ের অর্থনৈতিক কার্যাবলির অন্তর্ভুক্ত।
কৃষিকাজ, মাছ ধরা, পশুপালন, বনজ সম্পদ সংগ্রহ ও খনিজ উত্তোলন এ ধরনের কাজের উদাহরণ। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষি ও মৎস্যচাষ
বিশেষভাবে বড় ভূমিকা পালন করে।
দ্বিতীয় পর্যায়ের অর্থনৈতিক কার্যাবলি
প্রথম পর্যায় থেকে পাওয়া কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে নতুন পণ্য তৈরির কাজ দ্বিতীয় পর্যায়ের অর্থনৈতিক কার্যাবলির অংশ।
তুলা থেকে সুতা ও কাপড়, লোহা থেকে যন্ত্রপাতি কিংবা কৃষিপণ্য থেকে খাদ্যপণ্য তৈরি—সবই এর দৃষ্টান্ত। এ পর্যায়ের কেন্দ্রে রয়েছে শিল্পকারখানা।
তৃতীয় পর্যায়ের অর্থনৈতিক কার্যাবলি
তৃতীয় পর্যায়ের কার্যাবলির মূল বৈশিষ্ট্য সেবা প্রদান। পরিবহন, ব্যাংকিং, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ, ব্যবসা ও পর্যটন এর আওতায় পড়ে।
কৃষি ও শিল্পে উৎপাদিত পণ্য মানুষের হাতে পৌঁছে দিতে এই কার্যাবলি সহায়তা করে। বিভিন্ন সেবা আবার সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চার করে।
সম্পদ ও অর্থনৈতিক কার্যাবলির সম্পর্ক
সম্পদ না থাকলে অর্থনৈতিক কার্যাবলি পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। কৃষিকাজে মাটি ও পানি লাগে; শিল্পে লাগে কাঁচামাল, শ্রম, শক্তি ও মূলধন।
উৎপাদিত পণ্য মানুষের কাছে পৌঁছাতে প্রয়োজন হয় পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থার।
সম্পদই তাই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি গড়ে দেয়। প্রযুক্তি ও দক্ষতা প্রয়োগ করে মানুষ সম্পদের ব্যবহার বাড়ায় এবং এর মধ্য দিয়ে উৎপাদন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটায়।
সম্পদ সংরক্ষণ কেন জরুরি?
অনেক প্রাকৃতিক সম্পদই সীমিত। মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, বন উজাড়, পানিদূষণ ও খনিজ সম্পদের অপচয় ভবিষ্যতে সংকট ডেকে আনতে পারে।
বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা মেটানোর সময় তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে সম্পদ সংরক্ষণ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থনৈতিক কার্যাবলির গুরুত্ব
অর্থনৈতিক কার্যাবলি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং মানুষের আয় বাড়ায়। কৃষি খাদ্যের জোগান দেয়, শিল্প নানা পণ্য তৈরি করে, আর সেবা খাত মেটায় মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা।
দেশের বাণিজ্য, উৎপাদন, অবকাঠামো ও সামগ্রিক উন্নয়নও এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিল্প গড়ে ওঠার প্রশ্নে কাঁচামাল, শ্রম,
বাজার, যোগাযোগ, মূলধন ও প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য।
উপসংহার
মানুষের জীবন ও অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হলো সম্পদ। প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন বাড়ে,
জীবনযাত্রার মানও উন্নত হয়।
অন্যদিকে কৃষি, শিল্প ও সেবার মতো অর্থনৈতিক কার্যাবলি দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে। একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির জন্য তাই সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং
অর্থনৈতিক কার্যাবলির টেকসই উন্নয়ন অপরিহার্য।
মন্তব্য প্রধান বন্ধ আছে।
[…] বলে। পৃথিবীর কোনো সাধারণ জায়গায় মাধ্যাকর্ষণ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় না। বেশিরভাগ […]