
এবার শীত বেশি পড়বে কেন? লা-নিনা কী ও এর প্রভাব
এবার শীত বেশি পড়বে কেন? লা-নিনা কী?
শীতের মৌসুম ঘনিয়ে এলেই অনেকে জানতে চান, এবার কি শীত বেশি পড়বে? বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় শীতের তীব্রতা প্রতিবছর এক রকম থাকে না।
কোনো বছর হাড়কাঁপানো ঠান্ডা নামে, কোনো বছর শীত আসে অনেকটা নরম হয়ে। তাপমাত্রা, বায়ুপ্রবাহ, কুয়াশা,
পশ্চিমা লঘুচাপের মতো নানা আবহাওয়াগত উপাদান এই তারতম্য তৈরি করে।
প্রশান্ত মহাসাগরের একটি বড় জলবায়ুগত পরিবর্তন, লা-নিনা (La Niña), সেখানেও বৈশ্বিক আবহাওয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবু লা-নিনা এলেই বাংলাদেশে নিশ্চিত প্রচণ্ড শীত, এমন সোজা হিসাব মেলে না। লা-নিনা আসলে কী, আর শীতের সঙ্গে এর যোগসূত্রটাই বা কোথায়?
সহজ ভাষায় বিষয়টি দেখা যাক।
লা-নিনা কী?
নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি যখন স্বাভাবিকের চেয়ে ঠান্ডা হয়ে যায়, সেই জলবায়ুগত ঘটনাকেই বলে লা-নিনা।
এটি ENSO (El Niño–Southern Oscillation) নামের বিশাল জলবায়ু ব্যবস্থার একটি পর্যায়।
স্বাভাবিক সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানি পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমে সরে যায়। লা-নিনার সময় মহাসাগরের মধ্য
ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠ স্বাভাবিকের তুলনায় শীতল হয়ে পড়ে। বায়ুমণ্ডলের চাপ আর বায়ুপ্রবাহও তখন বদলে যায়।
এই পরিবর্তন প্রশান্ত মহাসাগরের গণ্ডিতে আটকে থাকে না। পৃথিবীর নানা অঞ্চলের বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও বায়ুপ্রবাহেও এর ছাপ পড়তে পারে।
লা-নিনা ও এল-নিনোর পার্থক্য
লা-নিনাকে ঠিকভাবে বুঝতে চাইলে এল-নিনো (El Niño) সম্পর্কেও ধারণা থাকা দরকার।
এল-নিনোর সময় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠ স্বাভাবিকের চেয়ে গরম হয়ে ওঠে।
লা-নিনা ঘটায় ঠিক উল্টোটা: একই অঞ্চলের পানি তখন তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে।
এক কথায়:
এল-নিনো → প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অংশে পানি বেশি উষ্ণ
লা-নিনা → প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অংশে পানি বেশি ঠান্ডা
সমুদ্রের তাপমাত্রার এই ওঠানামা বায়ুমণ্ডলের চলাচলকে নাড়া দেয়, আর তার জেরে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় আবহাওয়ার ধরন বদলে যেতে পারে।
লা-নিনা হলে শীত বেশি পড়ে কেন?
লা-নিনা বায়ুমণ্ডলের বড় পরিসরের প্রবাহে রদবদল ঘটাতে পারে। এতে কোনো কোনো অঞ্চলে ঠান্ডা বাতাসের আনাগোনা বাড়ে, শীতও গায়ে বেশি লাগে।
দক্ষিণ এশিয়ায় অবশ্য শীতের তীব্রতা একাধিক বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস,
আকাশের অবস্থা, কুয়াশা, বাতাসের গতি এবং পশ্চিমা আবহাওয়াজনিত ব্যবস্থা—সবকিছুই এখানে ভূমিকা রাখে।
ফলে লা-নিনা শীত বেশি হওয়ার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু একমাত্র নিয়ামক নয়।
বাংলাদেশে শীতের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
বাংলাদেশে শীত টের পাওয়া যায় মূলত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে ঠান্ডার দাপট সাধারণত বেশি থাকে।
উপকূল ও দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্র কাছে থাকায় তাপমাত্রার ওঠানামা খানিকটা ভিন্ন চেহারা নেয়।
লা-নিনার মতো বড় জলবায়ুগত পরিস্থিতি দেশের আবহাওয়ায় পরোক্ষ প্রভাব রাখতে পারে। শীতকালের বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রায়
তখন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
তবে বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট শীত মৌসুম কতটা ঠান্ডা হবে, তা শুধু লা-নিনা দেখে বলা যায় না।
কুয়াশা কি শীতকে বেশি অনুভূত করায়?
শীতে দেশের অনেক জায়গা ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায়। ভোর আর সকালের কুয়াশা সূর্যের আলোকে মাটিতে পৌঁছাতে দেরি করিয়ে দেয়। তাই দিনের শুরুটা বেশি ঠান্ডা লাগতে পারে।
কুয়াশা নিজে সব সময় তাপমাত্রা খুব একটা নামায় না। কিন্তু রোদের ঘাটতি আর বাতাসের অবস্থা মিলে মানুষের কাছে ঠান্ডাটা প্রকট হয়ে ওঠে।
উত্তরাঞ্চলের নদী-তীর ও নিচু এলাকায় শীতকালে কুয়াশা বেশি জমে, তাই সেখানে ঠান্ডার অনুভূতিও তীব্র হতে পারে।
উত্তর দিকের ঠান্ডা বাতাসের ভূমিকা
বাংলাদেশের শীতের পেছনে বড় একটি কারণ উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা ঠান্ডা, শুষ্ক বাতাস। শীতে উপমহাদেশের উত্তরাঞ্চলে
তাপমাত্রা নামলে সেখানকার হিমেল বাতাস দক্ষিণমুখী হতে পারে।
এই বাতাস বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে গেলে তাপমাত্রা কমে। উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ এর প্রভাব টের পান তুলনামূলক বেশি।
কোনো বছর শীত বেশি জেঁকে বসলে তার পেছনে ঠান্ডা বাতাসের প্রবাহ তাই বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কি শীত কমে যাচ্ছে?
জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে চলেছে, বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। তার মানে অবশ্য এই নয় যে প্রতি বছরই শীত কম পড়বে।
দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তন তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধরন বদলে দিতে পারে, আবহাওয়ায় চরম ওঠানামাও বাড়াতে পারে।
তাই কোনো বছর শীত তুলনামূলক উষ্ণ থাকলেও অল্প কয়েক দিনের তীব্র ঠান্ডা আসা অস্বাভাবিক নয়।
জলবায়ু পরিবর্তন এবং শীতের স্বল্পমেয়াদি আবহাওয়া—দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা দরকার।
লা-নিনা কি বাংলাদেশে নিশ্চিতভাবে বেশি শীত নিয়ে আসে?
না, এবং এই কথাটা মনে রাখা জরুরি।
লা-নিনা একটি বৈশ্বিক জলবায়ুগত ঘটনা, অঞ্চলভেদে এর প্রভাবও ভিন্ন। বাংলাদেশে শীত কতটা তীব্র হবে, তা ঠিক করে লা-নিনার সঙ্গে আঞ্চলিক বায়ুপ্রবাহ,
পশ্চিমা লঘুচাপ, কুয়াশা, মেঘ, বৃষ্টিপাতসহ আরও নানা আবহাওয়াগত উপাদান।
“লা-নিনা হয়েছে, তাই এবার প্রচণ্ড শীত পড়বে”—এমন উপসংহার তাই বৈজ্ঞানিকভাবে টেকে না।
এবার শীত সম্পর্কে কী জানা দরকার?
শীতের পূর্বাভাস বুঝতে একটিমাত্র কারণের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলে না। আবহাওয়া একটি জটিল ব্যবস্থা, যেখানে সমুদ্রের তাপমাত্রা, বায়ুর চাপ, বায়ুপ্রবাহ ও আঞ্চলিক আবহাওয়া একসঙ্গে কাজ করে।
লা-নিনা এই বিশাল ব্যবস্থারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা পৃথিবীর নানা প্রান্তের আবহাওয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে শীতের প্রকৃত তীব্রতা জানার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো সংশ্লিষ্ট সময়ের আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সরকারি আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য দেখা।
উপসংহার
লা-নিনা হলো নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার একটি জলবায়ুগত ঘটনা। বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রায় এর প্রভাব পড়তে পারে, বাংলাদেশেও পরোক্ষভাবে পড়া সম্ভব।
তবে এবারের শীত কেমন হবে, সেটি একা লা-নিনা ঠিক করে না। উত্তরের ঠান্ডা বাতাস, কুয়াশা, বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত আর অন্যান্য আবহাওয়াগত পরিস্থিতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শীতের আগাম খবর পেতে তাই বৈজ্ঞানিক আবহাওয়া তথ্যের ওপর ভরসা রাখাই সবচেয়ে ভালো।
মন্তব্য প্রধান বন্ধ আছে।
[…] গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রের উপরিভাগের তাপমাত্রা সাধারণত প্রায় ২৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস […]