
বাংলাদেশের জনসংখ্যা এত বেশি কেন? ভৌগোলিক ৫টি কারণ
বাংলাদেশের জনসংখ্যা এত বেশি কেন? ভৌগোলিক ৫টি কারণ
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল দেশ। আয়তনে ছোট এই ভূখণ্ডে বাস করে বিপুলসংখ্যক মানুষ।
এত মানুষ এখানে কেন, আর এর পেছনে কোন ভৌগোলিক কারণগুলো কাজ করেছে, সে প্রশ্ন কি কখনো মনে জেগেছে?
দীর্ঘকাল ধরে এ দেশের নদ-নদী, উর্বর মাটি, সমতল ভূমি,
অনুকূল জলবায়ু আর সহজলভ্য পানি মানুষকে এখানে বসতি গড়তে টেনেছে।
এই ব্লগ পোস্টে আমরা বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশি হওয়ার ৫টি প্রধান ভৌগোলিক কারণ খুঁজে দেখব।
সঙ্গে দেখব, এগুলো মানুষের জীবনযাত্রায় কী প্রভাব ফেলেছে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা এত বেশি কেন?
দক্ষিণ এশিয়ার নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীব্যবস্থার পলি জমে যে বিস্তীর্ণ সমভূমি তৈরি হয়েছে,
সেটিই এ দেশের ভূপ্রকৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও জনবসতির বিকাশে এই প্রাকৃতিক গঠন বড় ভূমিকা রেখেছে।
অবশ্য জনসংখ্যা বেশি হওয়ার একমাত্র কারণ ভূগোল নয়। ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ জন্মহার,
ক্রমে কমে আসা মৃত্যুহার এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতিও জনসংখ্যা বাড়িয়েছে।
১. উর্বর পলিমাটি ও কৃষিকাজের সুবিধা
ভৌগোলিক কারণগুলোর মধ্যে সবার আগে আসে উর্বর পলিমাটির কথা। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা এবং এদের শাখা-প্রশাখা যুগ যুগ ধরে বিপুল পলি বয়ে এনেছে।
সেই পলি জমেই দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তৈরি হয়েছে উর্বর কৃষিজমি।
এমন মাটিতে ধান, পাট, গম, শাকসবজিসহ নানা ফসল ভালো জন্মায়। তাই বহু মানুষের জীবিকার মূল ভরসা হয়ে উঠেছে কৃষিকাজ।
একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল ফলানোর সুযোগও আছে। এ কারণে সীমিত জমি থেকেই বিপুল মানুষের খাদ্যের জোগান দেওয়া গেছে,
আর কৃষিনির্ভর এই জীবনব্যবস্থাই ঐতিহাসিকভাবে ঘন জনবসতির ভিত গড়ে দিয়েছে।
২. বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি
দেশের বেশির ভাগ ভূখণ্ড সমতল, কোথাও কোথাও সামান্য ঢালু বদ্বীপীয় সমভূমি। এমন জমিতে ঘরবাড়ি তোলা, চাষাবাদ করা,
রাস্তাঘাট বানানো কিংবা যোগাযোগব্যবস্থা গড়া তুলনামূলক সহজ।
পাহাড়ি এলাকায় বসতি গড়তে বা চাষ করতে প্রায়ই অনেক বেশি পরিশ্রম লাগে। বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ সমতলে সে বাধা কম;
গ্রাম, বাজার, শহর ও কৃষিজমি গড়ে তোলার জায়গা এখানে অনেক বেশি।
এই সুবিধার জোরেই দেশের বড় অংশজুড়ে মানুষ বসবাস করতে পেরেছে, যা ঘন জনবসতির পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
৩. নদ-নদীর বিস্তৃত জাল
dhakatribune.com
বাংলাদেশকে আমরা নদীমাতৃক দেশ বলি। এখানকার অসংখ্য নদী ও শাখানদী কৃষি, মাছ ধরা, নৌপরিবহন আর দৈনন্দিন পানির প্রয়োজন মেটায়।
নদীর পানিতে জমিতে সেচ দেওয়া যায়। নদী মাছ জোগায়, নৌপথে মানুষ ও পণ্যও চলাচল করে। অতীতে এসব সুবিধাকে কেন্দ্র করেই নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল বাণিজ্যকেন্দ্র ও জনবসতি।
নদীবিধৌত সমভূমিতে চাষাবাদ ও জীবিকার সুযোগ থাকায় বহু মানুষ নদীর আশপাশেই ঘর বেঁধেছে।
তবে নদী শুধু সুবিধাই দেয় না। বন্যা, নদীভাঙন আর নদীপথের গতিপরিবর্তনে অনেকে বাড়িঘর হারায়, নতুন জায়গায় গিয়ে আবার বসতি গড়তে বাধ্য হয়।
৪. উষ্ণ ও আর্দ্র মৌসুমি জলবায়ু
observerbd.com
বাংলাদেশের জলবায়ু মূলত উষ্ণ ও আর্দ্র মৌসুমি ধরনের। গ্রীষ্মে বৃষ্টি হয়, বর্ষায় হয় প্রচুর। ধানসহ নানা ফসলের জন্য এই জলবায়ু বেশ অনুকূল।
পর্যাপ্ত বৃষ্টি আর উষ্ণ আবহাওয়া অনেক অঞ্চলে চাষাবাদের সুযোগ তৈরি করেছে। সে কারণে প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ এ অঞ্চলে থেকে জীবিকা চালাতে পেরেছে।
অন্যদিকে অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও লবণাক্ততার মতো সমস্যাও এখানে আছে। জলবায়ু তাই কৃষি ও বসতির সুযোগ যেমন দিয়েছে, তেমনি সঙ্গে এনেছে ঝুঁকিও।
৫. পানির সহজলভ্যতা ও প্রাকৃতিক সম্পদ
বেঁচে থাকা, চাষাবাদ, দৈনন্দিন কাজ, সবকিছুতেই পানি অপরিহার্য। বাংলাদেশের নদী, খাল, বিল, পুকুরসহ নানা জলাশয় বহু অঞ্চলে পানির উৎস হিসেবে কাজ করে।
সহজলভ্য পানি কৃষি, মাছ চাষ, গবাদিপশু পালন ও নানা অর্থনৈতিক কাজে সহায়তা করেছে। জলাশয় আর নদী ঘিরে গড়ে উঠেছে বহু মানুষের জীবিকা।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীবিকার এই সুযোগ দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনবসতি ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখন পানিদূষণ,
নিরাপদ পানির সংকট আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অনেক এলাকায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশি হওয়ার পেছনে কি শুধু ভূগোলই দায়ী?
না। ভৌগোলিক কারণের পাশাপাশি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক কারণও এখানে কাজ করেছে।
- ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ জন্মহার: অতীতে পরিবারগুলো বেশি সন্তান নিত, যা জনসংখ্যা বাড়িয়েছে।
- মৃত্যুহার হ্রাস: চিকিৎসা, টিকাদান, পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি মৃত্যুহার কমিয়ে এনেছে।
- কৃষিনির্ভর অর্থনীতি: উর্বর জমি ও চাষাবাদের সুযোগ দীর্ঘকাল ঘন জনবসতিকে টিকিয়ে রেখেছে।
- শহরমুখী অভিবাসন: কাজ, শিক্ষা ও চিকিৎসার খোঁজে মানুষ ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে এসে থিতু হচ্ছে।
মনে রাখা দরকার, জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর জনসংখ্যার ঘনত্ব এক জিনিস নয়। মোট মানুষের সংখ্যা বাড়াকে বলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি; আর প্রতি বর্গকিলোমিটারে কতজন মানুষ বাস করে,
সেটি জনসংখ্যার ঘনত্ব। আয়তন ছোট বলেই বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব এত বেশি।
উপসংহার
উর্বর পলিমাটি, বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি, নদ-নদীর বিস্তৃত জাল, মৌসুমি জলবায়ু ও পানির সহজলভ্যতা বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশি হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক কারণ।
এসব বৈশিষ্ট্য মিলে কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও মানুষের বসতির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
তবু কেবল প্রাকৃতিক সুবিধা দিয়ে দেশের বর্তমান জনসংখ্যার পুরো ব্যাখ্যা মেলে না। জন্মহার, মৃত্যুহার, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনকেও হিসাবে নিতে হবে।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে তাই পরিকল্পিত নগরায়ণ, কৃষিজমি সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা ও প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি।
মন্তব্য প্রধান বন্ধ আছে।
[…] ধর্মীয় কেন্দ্র। সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা আর বিখ্যাত ভ্যাটিকান জাদুঘর […]