
বাংলাদেশের ৮টি বিভাগের নামকরণের ইতিহাস: কেন এই নাম হলো?
বাংলাদেশের ৮টি বিভাগের নামকরণের ইতিহাস: কেন এই নাম হলো?
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ৮টি বিভাগে বিন্যস্ত: ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ।বাংলাদেশের ৮টি বিভাগের নামকরণের ইতিহাস
প্রত্যেকটি নামের পেছনে আছে দীর্ঘ ইতিহাস। কোথাও প্রাচীন জনপদের স্মৃতি, কোথাও শাসনব্যবস্থার ছাপ, কোথাও আবার স্থানীয় ঐতিহ্যের টান।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। সব নামের উৎপত্তির পক্ষে সমান নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলে না। কোনো কোনো নাম নিয়ে একাধিক মত চালু আছে।
আবার কিছু নামের সঙ্গে প্রাচীন রাজা, শাসক কিংবা স্থানীয় জনপদের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।
এবার একে একে দেখা যাক, কোন বিভাগের নাম কীভাবে এল।
১. ঢাকা: রাজধানী থেকে বিভাগের পরিচয়
ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। নামটি কোথা থেকে এসেছে, সে প্রশ্নে ইতিহাসবিদেরা একমত নন।
প্রচলিত একটি মত বলে, প্রাচীনকালে এ অঞ্চলে প্রচুর ঢাক গাছ জন্মাত। ধারণা করা হয়, সেই গাছের নামই পরে জায়গাটির নাম হয়ে দাঁড়ায়।
আরেকটি মতও বেশ জনপ্রিয়। ১৬১০ সালে ইসলাম খান চিশতি বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে সরিয়ে আনেন ঢাকায়। লোকমুখে শোনা যায়,
নতুন রাজধানী উদ্বোধনের সময় যে ঢাক বাজানো হয়েছিল, তা থেকেই ‘ঢাকা’ নামের জন্ম।
ইতিহাসের নিরিখে যা নিশ্চিত, তা হলো মুঘল আমলেই ঢাকার গুরুত্ব বাড়ে। ১৬১০ সালে ইসলাম খান রাজধানী এখানে স্থানান্তর করার পর সম্রাট জাহাঙ্গীরের
নামে শহরটির নতুন নাম হয় জাহাঙ্গীরনগর। সাধারণ মানুষের মুখে অবশ্য ‘ঢাকা’ নামটিই টিকে যায়।
পরে, ১৮২৯ সালে, ঢাকা একটি বিভাগের সদর দপ্তরে পরিণত হয়।
২. চট্টগ্রাম : প্রাচীন নামগুলোর ইতিহাস
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ জনপদ চট্টগ্রাম। এর নামের উৎস নিয়ে মতের অভাব নেই।
চট্টগ্রাম বিভাগের সরকারি তথ্য বলছে, প্রাচীন নানা নথি, মানচিত্র ও লেখায় অঞ্চলটির উল্লেখ পাওয়া যায় চট্টল, চৈত্যগ্রাম, চাটিগাঁও, চাটিগ্রামসহ বিভিন্ন নামে।
একটি মত অনুসারে, নামটির উৎস হতে পারে চৈত্যগ্রাম। ধারণা করা হয়, প্রাচীনকালে এখানে বৌদ্ধ চৈত্য বা ধর্মীয় স্থাপনা থাকায় এই নাম চালু হয়েছিল।
কেউ কেউ আবার নামটির শিকড় খোঁজেন সংস্কৃত চতুঃগ্রাম শব্দে। ‘চট্টল’ থেকে বর্তমান চট্টগ্রাম নামটি এসেছে, এমন মতও আছে।
ফলে চট্টগ্রাম নামের নির্দিষ্ট ও সর্বসম্মত কোনো উৎস আজও নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠা পায়নি।
৩. রাজশাহী বিভাগের নামকরণের ইতিহাস
রাজশাহী নামটির সঙ্গে রাজা ও শাসকদের ইতিহাস জড়িয়ে আছে, এমন ধারণা বহুদিনের।
রাজশাহী বিভাগের সরকারি তথ্যে বলা হয়েছে, নানা সময়ে এ অঞ্চলে রাজা-জমিদারেরা বসবাস ও শাসন করেছেন। সম্ভবত সে কারণেই ‘রাজশাহী’ নামটি প্রচলিত হয়।
আরও একটি মত চালু আছে। পঞ্চদশ শতকে এই অঞ্চলের অধিপতি রাজা কংস বা গণেশ পরিচিত ছিলেন ‘রাজা শাহ’ নামে। ‘রাজা’ এবং ‘শাহ’,
এই দুই শব্দ জুড়েই রাজশাহী নামের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়।
প্রশাসনিক ইতিহাসেও রাজশাহী বেশ পুরোনো। ১৮২৯ সালে রাজশাহী বিভাগ গঠিত হয়। সে সময় এর আওতায় বর্তমান বাংলাদেশের বাইরের কিছু এলাকাও ছিল।
পরে প্রশাসনিক সীমানায় পরিবর্তন আসে।
৪. খুলনা বিভাগের নামকরণের ইতিহাস
খুলনার নাম নিয়েও ব্যাখ্যা একটি নয়।
খুলনা জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, প্রচলিত একটি ধারণায় এ অঞ্চলের নামকে যুক্ত করা হয় ধনপতি সওদাগরের দ্বিতীয় স্ত্রী খুলনা-র সঙ্গে।
তাঁর নামে নির্মিত ‘খুলনেশ্বরী মন্দির’ থেকেই খুলনা নামটি এসেছে বলে অনেকে মনে করেন।
অন্যদিকে ১৭৬৬ সালের এক নাবিক-রেকর্ডে Culnea শব্দটির দেখা মেলে। কারও কারও মতে, এই শব্দই কালক্রমে খুলনায় রূপ নিয়েছে।
‘কিসমত খুলনা’ মৌজা এবং ব্রিটিশ আমলের মানচিত্রে ব্যবহৃত ‘Jessore-khulna’ নামের সঙ্গেও খুলনার যোগসূত্রের কথা ওঠে।
তবে এর কোনটি সঠিক, সে প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর এখনো মেলেনি।
প্রশাসনিকভাবে খুলনা বিভাগের যাত্রা শুরু ১৯৬০ সালে। রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগের কিছু জেলা নিয়ে তখন নতুন এই বিভাগটি গড়ে তোলা হয়।
৫. বরিশাল বিভাগের নামকরণের ইতিহাস
বরিশাল নামের উৎপত্তি ঘিরেও বেশ কয়েকটি মত প্রচলিত।
লোকমুখে শোনা একটি ধারণা হলো, এ অঞ্চলে একসময় প্রচুর শাল গাছ ছিল। কারও মতে, ‘বড় শাল’ বা শাল গাছ-সম্পর্কিত কোনো শব্দ থেকেই বরিশাল নামটি এসেছে।
আরেকটি মতে পর্তুগিজ বণিকদের সঙ্গে নামটির সম্পর্ক টানা হয়। ‘বরিসল্ট’ শব্দ থেকে বরিশাল নামের উৎপত্তি, এমন ধারণাও আছে।
বলা হয়, শব্দটি বড় আকারের লবণের দানা কিংবা লবণের ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
তবে এগুলো মূলত প্রচলিত মত আর লোককথা। বরিশাল নামের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ সীমিত।
খুলনা বিভাগের কয়েকটি জেলা নিয়ে ১৯৯৩ সালে গঠিত হয় বরিশাল বিভাগ।
৬. সিলেট বিভাগের নামকরণের ইতিহাস
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাচীন জনপদ সিলেট। পাহাড়, সমতল আর হাওর মিলে এর ভূপ্রকৃতি।
সিলেট নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় কিংবদন্তি। এর মধ্যে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সিলেট বিজয়কে ঘিরে
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত কাহিনিগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
নামের প্রাচীন রূপ কী ছিল আর এর প্রকৃত উৎপত্তি কোথায়, দুটো প্রশ্নেই মত ভিন্ন ভিন্ন। তাই কোনো একটি কারণকে চূড়ান্ত ইতিহাস বলে দাবি করা কঠিন।
প্রশাসনিক দিক থেকে অবশ্য সিলেটের গুরুত্ব বহু পুরোনো। ১৭৭২ সালের ১৭ মার্চ সিলেট জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭৪ সালে জেলাটি আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় গণভোটের মাধ্যমে সিলেটের অধিকাংশ এলাকা যুক্ত হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে।
এরপর ১৯৯৫ সালের ১ আগস্ট গঠিত হয় সিলেট বিভাগ।
৭. রংপুর বিভাগের নামকরণের ইতিহাস
বিভিন্ন সরকারি সূত্রে রংপুরের পুরোনো নাম হিসেবে রঙ্গপুর-এর উল্লেখ আছে। কিন্তু এই নাম কীভাবে এল, সে নিয়ে মতভেদ এখনো কাটেনি।
প্রচলিত এক ধারণা অনুযায়ী, মহাভারতের যুগের প্রাগজ্যোতিষপুরের রাজা ভগদত্তের রংমহল থেকেই ‘রঙ্গপুর’ নামটির জন্ম।
অন্য একটি ধারণা বলে, এ অঞ্চলে নীল ও অন্যান্য রং তৈরি কিংবা কাপড় রাঙানোর চল ছিল। সেখান থেকেই নাম হয় ‘রঙ্গপুর’।
কিছু ঐতিহাসিক আবার মনে করেন, মধ্যযুগে বখতিয়ার খলজির শাসনামলের সঙ্গে ‘রঙ্গপুর’ নামের যোগ থাকতে পারে। রংপুর জেলার সরকারি তথ্যেও স্বীকার করা হয়েছে
যে নামটির উৎপত্তি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
রংপুর বিভাগ প্রশাসনিকভাবে গঠিত হয় ২০১০ সালে। রংপুর অঞ্চলের যে আটটি জেলা আগে রাজশাহী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল, সেগুলো নিয়েই নতুন বিভাগটি গড়া হয়।
৮. ময়মনসিংহ বিভাগের নামকরণের ইতিহাস
ময়মনসিংহ নামের ইতিহাসও কম আকর্ষণীয় নয়।
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, মুঘল আমলে মোমেনশাহ নামের এক সাধকের সঙ্গে এ অঞ্চলের নামের সম্পর্ক আছে। ধারণা করা হয়,
তাঁর নাম থেকেই ‘মোমেনশাহী’ নামটি চালু হয়।
অন্যদিকে ষোড়শ শতকে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ তাঁর পুত্র নসরত শাহের জন্য এ অঞ্চলে একটি রাজ্য গড়ে তোলেন।
সেই সূত্রে প্রচলন ঘটে নসরতশাহী বা নাসিরাবাদ নামের।
ঐতিহাসিক নথিপত্রেও অঞ্চলটির নামের নানা রূপ চোখে পড়ে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৭৭৯ সালের রেনেলের মানচিত্রে পাওয়া ‘Momesing’ নামটি বর্তমান ময়মনসিংহ অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের সবচেয়ে নবীন বিভাগ ময়মনসিংহ। একসময় ঢাকা বিভাগের অংশ থাকা এই অঞ্চলকে ২০১৫ সালে অষ্টম বিভাগের মর্যাদা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের ৮ বিভাগের নাম এক নজরে
| বিভাগ | নামের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রধান ইতিহাস | বিভাগ গঠনের সময় |
|---|---|---|
| ঢাকা | নামের উৎপত্তি নিয়ে একাধিক মত; মুঘল আমলে গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী | ১৮২৯ |
| চট্টগ্রাম | চট্টল, চৈত্যগ্রাম, চাটিগাঁও ইত্যাদি প্রাচীন নামের সঙ্গে সম্পর্ক | প্রাচীন প্রশাসনিক ইতিহাস |
| রাজশাহী | ‘রাজা’ ও ‘শাহ’ থেকে নামের উৎপত্তির প্রচলিত মত | ১৮২৯ |
| খুলনা | খুলনেশ্বরী, Culnea ও কিসমত খুলনা নিয়ে বিভিন্ন মত | ১৯৬০ |
| বরিশাল | শাল গাছ, বরিসল্টসহ বিভিন্ন প্রচলিত মত | ১৯৯৩ |
| সিলেট | প্রাচীন জনপদ; নামের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত ও কিংবদন্তি | ১৯৯৫ |
| রংপুর | রঙ্গপুর নাম থেকে বর্তমান রংপুর; উৎপত্তি নিয়ে মতভেদ | ২০১০ |
| ময়মনসিংহ | মোমেনশাহী, নাসিরাবাদ ও প্রাচীন নথির বিভিন্ন নাম | ২০১৫ |
উপসংহার
বাংলাদেশের ৮টি বিভাগের নামকরণের ইতিহাস, বাংলাদেশের ৮টি বিভাগের নাম নিছক প্রশাসনিক পরিচয় বহন করে না। প্রতিটি নামের আড়ালে রয়েছে শত শত বছরের ইতিহাস, যেখানে মিশে আছে জনপদ, রাজা-জমিদার, শাসনব্যবস্থা, ধর্মীয় ঐতিহ্য আর লোককথা।
কোনো কোনো নামের উৎস সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্য তুলনামূলক স্পষ্ট। আবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও রংপুরের মতো নামের বেলায় একাধিক মত পাশাপাশি টিকে আছে। এ কারণে এসব নামের ইতিহাস খুঁজতে গেলে প্রমাণিত তথ্য এবং লোকপ্রচলিত কাহিনির মধ্যে পার্থক্য মাথায় রাখা জরুরি।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ, আজকের এই আটটি বিভাগের নামের ইতিহাস বাংলাদেশের ভূগোল ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরই এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মন্তব্য প্রধান বন্ধ আছে।
[…] যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ও তিস্তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে এগুলোর কোনোটিরই […]