
বিদ্যুৎ চমকালে কী ঘটে? বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক রহস্য
বিদ্যুৎ চমকালে কী ঘটে? আকাশে বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক রহস্য
কখনো কি ভেবে দেখেছেন, বিদ্যুৎ চমকালে কী ঘটে? আকাশে তখন আসলে কী ধরনের বৈদ্যুতিক ঘটনা ঘটে?
বর্ষাকালে কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেলে হঠাৎ চারপাশ আলোকিত হয়ে ওঠে। কয়েক সেকেন্ড পর শোনা যায় বিকট শব্দ।
আমরা সাধারণভাবে একে বজ্রপাত বা বিদ্যুৎ চমকানো বলি।
বজ্রপাত প্রকৃতির একটি শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ঘটনা। সাধারণত বজ্রঝড়ের সময় মেঘের ভেতরে বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হয়।
এই চার্জের ভারসাম্য নষ্ট হলে হঠাৎ শক্তিশালী বৈদ্যুতিক স্রাব ঘটে। সেই স্রাবের আলোই আমরা বিদ্যুৎ চমকানো হিসেবে দেখি।
বজ্র মেঘের মধ্যে কী ঘটে?
বজ্রপাতের শুরু হয় সাধারণত বিশাল বজ্রগর্ভ মেঘের মধ্যে। এই ধরনের মেঘকে বলা হয় কিউমুলোনিম্বাস মেঘ। মেঘের ভেতরে প্রচণ্ড বাতাসের ওঠানামা থাকে।
মেঘের মধ্যে থাকা ছোট বরফের কণা, বড় বরফকণা এবং পানির ফোঁটাগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেতে থাকে। এসব সংঘর্ষের ফলে বৈদ্যুতিক চার্জ আলাদা হয়ে যায়।
সাধারণভাবে মেঘের উপরের অংশে ধনাত্মক চার্জ এবং নিচের অংশে ঋণাত্মক চার্জ বেশি জমা হতে পারে। এভাবে মেঘের ভেতরে একটি শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি হয়।
বিদ্যুৎ চমকালে কী ঘটে?
যখন মেঘের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জের পার্থক্য অনেক বেশি হয়ে যায়, তখন বাতাস আর সেই বৈদ্যুতিক চাপকে প্রতিরোধ করতে পারে না।
তখন বিদ্যুৎ একটি পথ তৈরি করে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে যায়।
এই বৈদ্যুতিক স্রাবই হলো বজ্রপাত।
বিদ্যুৎ শুধু মেঘের ভেতরেই ঘটতে পারে না। কখনো একটি মেঘ থেকে অন্য মেঘে, আবার কখনো মেঘ থেকে পৃথিবীর মাটিতেও বৈদ্যুতিক স্রাব হতে পারে।
মেঘ থেকে মাটিতে বজ্রপাত হলে সেটি বিশেষভাবে শক্তিশালী এবং বিপজ্জনক হতে পারে।
আমরা বিদ্যুতের আলো আগে দেখি কেন?
বজ্রপাতের সময় আমরা প্রথমে আকাশে উজ্জ্বল আলো দেখতে পাই এবং কিছুক্ষণ পর বজ্রের শব্দ শুনতে পাই। এর কারণ হলো আলোর গতি শব্দের চেয়ে অনেক বেশি।
বিদ্যুৎ চমকানোর আলো আমাদের চোখে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে যায়। কিন্তু বজ্রপাতের ফলে তৈরি শব্দ বাতাসের মধ্য দিয়ে তুলনামূলকভাবে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে।
তাই দূরে বজ্রপাত হলে প্রথমে আলো দেখা যায় এবং কয়েক সেকেন্ড পর শব্দ শোনা যায়।
বজ্রপাতের সময় আকাশে এত উজ্জ্বল আলো কেন হয়?
বজ্রপাতের বৈদ্যুতিক স্রাবের সময় বাতাসের মধ্য দিয়ে প্রচুর পরিমাণে শক্তি প্রবাহিত হয়। এর ফলে বজ্রপাতের পথের বাতাস অত্যন্ত দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে যায়।
এই উত্তপ্ত বাতাস উজ্জ্বল আলো তৈরি করে। সেই আলো এত তীব্র হতে পারে যে রাতের অন্ধকার আকাশও মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে ওঠে।
বজ্রপাতের আলোকে আমরা সাধারণত একটি সরু, বাঁকানো বা শাখা-প্রশাখার মতো রেখা হিসেবে দেখতে পাই।
বজ্রের শব্দ কীভাবে তৈরি হয়?
বিদ্যুৎ চমকানোর সঙ্গে যে বিকট শব্দ হয়, সেটিই আমরা বজ্রধ্বনি হিসেবে শুনি।
বজ্রপাতের সময় তার চারপাশের বাতাস খুব দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে প্রসারিত হয়। এই দ্রুত প্রসারণের ফলে বাতাসে একটি শক্তিশালী চাপের তরঙ্গ তৈরি হয়।
সেই চাপের তরঙ্গ আমাদের কানে পৌঁছালে আমরা বজ্রধ্বনি শুনতে পাই।
বজ্রপাতের কাছাকাছি হলে শব্দ অনেক বেশি জোরে শোনা যায়। দূরে হলে শব্দ কিছুটা দুর্বল হয়ে আসে।
বিদ্যুৎ চমকানো কি সব সময় বিপজ্জনক?
আকাশে বিদ্যুৎ চমকানো একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও বজ্রপাত মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।
বিশেষ করে মেঘ থেকে মাটিতে বজ্রপাত হলে মানুষ, প্রাণী, গাছ এবং বৈদ্যুতিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বজ্রঝড়ের সময় খোলা মাঠ, উঁচু গাছের নিচে বা পানির কাছাকাছি থাকা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বজ্রপাতের সময় নিরাপদ ভবন বা আশ্রয়স্থলে থাকা ভালো।
ঘরের ভেতরে থাকলেও জানালা, দরজা এবং বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থেকে দূরে থাকা নিরাপদ।
বজ্রপাত কি পৃথিবীর জন্য উপকারী?
বজ্রপাত শুধু বিপজ্জনক নয়; প্রকৃতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াতেও এর ভূমিকা রয়েছে।
বজ্রপাতের প্রচণ্ড শক্তি বায়ুমণ্ডলের কিছু নাইট্রোজেনকে এমন যৌগে পরিবর্তন করতে সাহায্য করে, যা পরে বৃষ্টির পানির সঙ্গে মাটিতে পৌঁছাতে পারে।
এই যৌগগুলো মাটিতে নাইট্রোজেনের উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। নাইট্রোজেন উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বজ্রপাত মানুষের জন্য নিরাপদ। এর শক্তি অত্যন্ত বেশি হওয়ায় বজ্রপাত থেকে দূরে থাকা জরুরি।
বজ্রপাত থেকে কীভাবে নিরাপদ থাকা যায়?
বজ্রঝড় শুরু হলে নিরাপদ থাকার জন্য কয়েকটি বিষয় মনে রাখা উচিত।
প্রথমত, খোলা মাঠ বা উঁচু জায়গায় অবস্থান না করে দ্রুত নিরাপদ ভবনের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, বড় একা গাছের নিচে দাঁড়ানো উচিত নয়।
তৃতীয়ত, নদী, পুকুর বা অন্য কোনো জলাশয়ের কাছ থেকে দূরে থাকা ভালো।
বাড়ির ভেতরে থাকলে অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করাই নিরাপদ। ঝড়ের সময় বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
তাহলে বিদ্যুৎ চমকালে কী ঘটে? সহজভাবে বললে, বজ্রঝড়ের মেঘের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হওয়ার পর চার্জের পার্থক্য অনেক বেড়ে গেলে হঠাৎ শক্তিশালী বৈদ্যুতিক স্রাব ঘটে।
সেই স্রাবের ফলে প্রচণ্ড আলো ও তাপ তৈরি হয়। বাতাস দ্রুত উত্তপ্ত ও প্রসারিত হওয়ার কারণে পরে আমরা বজ্রধ্বনি শুনতে পাই।
বিদ্যুৎ চমকানো তাই শুধু আকাশের একটি সুন্দর আলোর ঝলক নয়; এটি বায়ুমণ্ডলের একটি শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ঘটনা।
এর পেছনে রয়েছে মেঘ, পানি, বরফের কণা, বৈদ্যুতিক চার্জ এবং বায়ুমণ্ডলের জটিল মিথস্ক্রিয়া।
প্রকৃতির এই অসাধারণ ঘটনাটি যেমন বিস্ময়কর, তেমনি বজ্রপাতের সময় নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য প্রধান বন্ধ আছে।
[…] are primarily caused by tectonic plate movement. The Earth’s outer shell has fractured into a number of large pieces known as tectonic plates. Their movement is […]